Saturday, April 18, 2026
Homeদেশগ্রামসূর্যমুখীতে বদলাচ্ছে টাঙ্গাইলের কৃষি অর্থনীতির মানচিত্র

সূর্যমুখীতে বদলাচ্ছে টাঙ্গাইলের কৃষি অর্থনীতির মানচিত্র

শফিকুজ্জামান খান মোস্তফা, টাঙ্গাইল 

ধু-ধু বালুচর, চোখ যতদূর যায় শুধু হলুদের সমারোহ। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের দিকে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকা সূর্যমুখীর সারি যেন ঘোষণা দিচ্ছে—যমুনার চর আর অনাবাদি নয়, এটি এখন সম্ভাবনার মাঠ। যমুনা নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ফুটে ওঠা এই সোনালি আভা টাঙ্গাইলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় ১৭৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। সদর ও বাসাইল উপজেলাই এগিয়ে—দুটি মিলিয়ে ৯১ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে এই তেলবীজ ফসল। গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮-১০ হেক্টর জমি বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও মাঠপর্যায়ের পরামর্শে ফলনও হয়েছে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।

একসময় যেসব চরাঞ্চল অনাবাদি পড়ে থাকত, আজ সেখানেই দিগন্তজোড়া সূর্যমুখী। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে সূর্যমুখীর আবাদ কয়েকগুণ বাড়তে পারে।

কৃষকদের হিসাব বলছে, প্রতি বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষে খরচ হয় মাত্র ৫-৬ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে ২০-২৫ হাজার টাকার বীজ বিক্রি সম্ভব। শুধু বীজ নয়—সূর্যমুখীর খৈল মাছ ও গবাদিপশুর পুষ্টিকর খাদ্য, শুকনো গাছ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ফলে এক ফসল থেকেই মিলছে বহুমাত্রিক সুবিধা। সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, আগে তিল বা বাদাম চাষে তেমন লাভ হতো না। কৃষি অফিসের পরামর্শে সূর্যমুখী চাষ করে এবার তারা আশাবাদী। প্রতিটি ফুলেই দানা পুষ্ট হয়েছে, বাজারদরও অনুকূলে।

কৃষিবিদদের মতে, রবি মৌসুম (মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য ডিসেম্বর) সূর্যমুখী চাষের উপযুক্ত সময়। তবে সুনিষ্কাশিত বেলে-দোআঁশ বা দোআঁশ মাটিতে সারা বছরই আবাদ সম্ভব। ২-৩ বার সেচ, আগাছা দমন ও নিয়মিত পরিচর্যায় ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। দেশে বর্তমানে উচ্চফলনশীল বারি সূর্যমুখী-২, বারি সূর্যমুখী-৩, ডিএস-১ ও হাইসান-৩৩ জাতের চাষ বেশি হয়। বারি সূর্যমুখী-২ জাতের বীজে ৪২-৪৪ শতাংশ পর্যন্ত তেল থাকে। হাইব্রিড জাতগুলো তুলনামূলক বেশি ফলনশীল এবং কিছু ক্ষেত্রে লবণাক্ততা সহনশীল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সূর্যমুখীর তেল হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং এতে কোলেস্টেরলের মাত্রা কম। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায় দেশীয় উৎপাদনের গুরুত্ব বেড়েছে। টাঙ্গাইলের ১৭৮ হেক্টর জমির উৎপাদন স্থানীয় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলা কৃষি কর্মকর্তারা জানান, কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ ও উন্নত বীজ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে সূর্যমুখী চাষ সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হয়েছে। যমুনার পলিবিধৌত মাটি এই ফসলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ফলনও আশাতীত হয়েছে।

দিগন্তজোড়া হলুদ ফুল শুধু প্রকৃতির রূপই বাড়াচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে কৃষকের ভাগ্যের হিসাব। যমুনার চরে ফুটে ওঠা এই সূর্যমুখী এখন টাঙ্গাইলের কৃষি অর্থনীতির সোনালি স্বাক্ষর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

সর্বাধিক জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য