রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রায় ঘোষণার জন্য আজ রোববার (৭ জুন) দিন ধার্য করেছেন।
রায়কে কেন্দ্র করে আজ সকাল ৮ টা ৪৯ মিনিটে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে এবং এর কিছুটা আগে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগার থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় এনে রাখা হয়েছে। সকাল ১১ টায় শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে দুই আসামি এবং উভয়পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করা হবে।
শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় নজিরবিহীন গতিতে মামলাটি বিচারের শেষ পর্যায়ে পৌঁছাল। রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে, মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণ, ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ রিপোর্ট ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাই তারা উভয় আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রধান আসামি সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অন্য আসামি সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট আইনে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড চেয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগার থেকে ঢাকার আদালতে আনা হয়। পরে তাদের ঢাকা দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের মতে, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ রিপোর্ট এবং স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। গত ১৯ মে পল্লবীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা করেন।
পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয়। মামলায় সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে তদন্ত শেষে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সাক্ষ্য-প্রমাণে স্পষ্ট হয়েছে যে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের সহায়তায় ভিকটিমকে ধর্ষণ, হত্যা এবং পরে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে গুম করার চেষ্টা করা হয়।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিশেষ পিপি অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় আসামির বক্তব্য দেওয়ার নির্দিষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সোহেল রানা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কোথাও ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির কথা বলেননি। তিনি বলেন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় ৩৪২ ধারায় আসামি পরীক্ষার সময় হঠাৎ ওই নামের উল্লেখ করেছেন। এটি জেলখানায় কোনো কুচক্রী ব্যক্তির পরামর্শে বলা হয়ে থাকতে পারে এবং আদালতের বিবেচনায় এর কোনো ভিত্তি নেই।
দুলু বলেন, তদন্ত ও মামলার নথিপত্রেও ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যায়ে এসে এমন নাম উল্লেখ জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বিচার বিলম্বিত করার অপচেষ্টা হতে পারে। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি দেয়, ঘটনাটি ঘটেছে আসামিদের বসবাস করা ফ্ল্যাটে, যা ভিকটিমের পরিবারের ফ্ল্যাটের বিপরীতে অবস্থিত। সাক্ষ্য অনুযায়ী ওই ফ্ল্যাটের বাকি দুটি কক্ষ তালাবদ্ধ ছিল এবং আসামিদের ব্যবহৃত কক্ষ ছাড়া সেখানে অন্য কারও উপস্থিতি ছিল না।
দুলু বলেন, অ্যাভিডেন্স অ্যাক্টের ১০৬ ধারা অনুযায়ী ফ্ল্যাটের ভিতরে কী ঘটেছে সে বিষয়ে ‘স্পেশাল নলেজ’ বা বিশেষ জ্ঞান আসামিদের কাছেই রয়েছে। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির অনুযায়ী কারও হেফাজতে বা সান্নিধ্যে থাকা অবস্থায় মৃত্যু ঘটলে সেই মৃত্যুর ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তায়। কিন্তু এই মামলায় রামিসার মৃত্যু কিংবা মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার বিষয়ে আসামিরা কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ আদালতে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা ছুরিটির ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার সময় সোহেল রানা মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রধান আসামির জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়ার আবেদন জানান। এর আগে বুধবার আত্মপক্ষ সমর্থন ও সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য দিন ধার্য করেন।


















