Homeঅপরাধহত্যার পর এআই দিয়ে জীবিত দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়, সেই মেধাবী শিক্ষার্থী রাকিবুল...

হত্যার পর এআই দিয়ে জীবিত দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায়, সেই মেধাবী শিক্ষার্থী রাকিবুল পেল জিপিএ-৫


টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনে আনন্দের বদলে কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদির আটা গ্রামের খাদেমুল ইসলামের পরিবার। মেধাবী সন্তান রাকিবুল ইসলাম মানবিক বিভাগে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় পেয়েছেন জিপিএ-৫। কিন্তু এই সাফল্যের আনন্দ ভাগাভাগি করতে আর কোনো দিন বাড়ি ফিরবে না সে।

কৃষক বাবা খাদেমুল ইসলামের ছোট ছেলে রাকিব। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় গিয়েছিলেন তিনি। স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশের সেবা করবেন, মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবেন। পরিবারের ইচ্ছা ছিল, ছেলে ভালো ফল করলে বাড়িতে মিষ্টি বিতরণ করবেন। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত দিন এসেছে এক বুক শোক নিয়ে। যে বাড়িতে আজ আনন্দের উৎসব হওয়ার কথা, সেখানে এখন শুধুই কান্না আর হারানোর বেদনা। রাকিবের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম জীবন তাঁর ছোট ভাইয়ের জিপিএ-৫ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ফলাফলের এই সংবাদ পরিবারকে গর্বিত করলেও সেই গর্বের সঙ্গে মিশে আছে অসহনীয় কষ্ট।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত (১৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় রাকিবকে হত্যার অভিযোগে আব্দুল্লাহ মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, হত্যার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিবকে জীবিত দেখিয়ে ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠানো হয় এবং ১৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় দরিদ্র কৃষক বাবা খাদেমুল ইসলাম ধারদেনা ও সুদে টাকা সংগ্রহ করে ৪ লাখ টাকা পাঠান। কিন্তু টাকা পেয়েও রাকিবকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। মুক্তিপণের জন্য অপহরণের পর হত্যার শিকার হন রাকিব। নিখোঁজের ২০ দিন পর নীলফামারীর ডিমলায় মাটির নিচ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান।

এ ঘটনায় পরিবারের অভিযোগের পর তদন্তে নামে পুলিশ। ঢাকার শুক্রাবাদ এলাকা থেকে মামুন রহমান (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া গ্রামের একটি বাড়ির মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের এই দিনে রাকিবের থাকার কথা ছিল সাফল্যের আনন্দে। মা-বাবার মুখে থাকার কথা ছিল গর্বের হাসি। অথচ জিপিএ-৫ পেয়েও তিনি নেই পরিবারের পাশে। রাকিবের ফল এসেছে, কিন্তু ফেরেনি রাকিব। কৃষক বাবার স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া ছেলেটি আজ শুধুই স্মৃতি। মিষ্টি বিতরণের স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষায় থাকা মা-বাবার চোখে আজ জমেছে অশ্রু। নিহত রাকিবের পরিবারের এখন একটাই দাবি, হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

নিহত রাকিবের বাবা খাদেমুল ইসলাম বলেন, ছেলে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ খবরে আমাদের অনেক আনন্দ হওয়ার কথা ছিল। স্বপ্ন ছিল, ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে, বড় হবে। কিন্তু ছেলের এই সাফল্যের আনন্দটুকুও উপভোগ করতে পারলাম না। মুক্তিপণ দিয়েছিলাম তাকে ফিরে পাওয়ার আশায়। টাকা দিয়েও ছেলেকে জীবিত পেলাম না।
মা জাহুরা বেগম বলেন, ছেলের ভালো ফলাফলে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে একদিন আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দের বদলে এখন ছেলেকে হারানোর কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার পর ছেলেকে নিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছিল পরিবার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই থেমে গেল তার জীবন। ছেলের ফলাফলে আনন্দ করার বদলে এখন তার বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি।#

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

সর্বাধিক জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য