রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে পেনশন বৃদ্ধি, ‘এক পদ এক পেনশন’ (ওআরওপি) বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য ভাতা যুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, উভয়ই গত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। নতুন স্কেলে ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বাড়ছে প্রায় ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপরই সন্ধ্যা ৭টায় তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে ব্রিফিং করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি।
নতুন কাঠামোয় সবচেয়ে বড় সুবিধা পাচ্ছেন নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বাড়ছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ। নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাতও কমিয়ে আনা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বর্তমানে এই অনুপাত ১:১.৯৪৫ থাকলেও নতুন স্কেলে তা ১:১.৭৮ করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, এতে বেতন কাঠামোয় ন্যায্যতা ও ভারসাম্য বাড়বে।
নতুন বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও পুরো সুবিধা একসঙ্গে মিলবে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে। কোন গ্রেডে কত বেতন : প্রথম গ্রেডের ৭৮ হাজার টাকার বেতন নতুন স্কেলে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। দ্বিতীয় গ্রেডে ৬৬ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। তৃতীয় গ্রেডে ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা। এছাড়া চতুর্থ গ্রেডে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৪৩ হাজার থেকে ৮৬ হাজার টাকা, ষষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭১ হাজার টাকা, সপ্তম গ্রেডে ২৯ হাজার থেকে ৫৮ হাজার টাকা, অষ্টম গ্রেডে ২৩ হাজার থেকে ৪৬ হাজার টাকা এবং নবম গ্রেডে ২২ হাজার থেকে ৪৪ হাজার টাকা করা হয়েছে। দশম গ্রেডে বর্তমান ১৬ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩২ হাজার টাকা। ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। এ দুই গ্রেডেও বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ। এর পরের গ্রেডগুলোতে বেতন বৃদ্ধির হার আরও বেশি। ১২তম গ্রেডে বর্তমান ১১ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা, যা প্রায় ১১৫ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার টাকা, বৃদ্ধির হার ১১৮ শতাংশ।
১৪তম গ্রেডে ১১ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার টাকা, অর্থাৎ ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, যা ১৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৬তম গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৯০০ টাকা। এ গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার ১৩৫ শতাংশ। ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৪০০ টাকা, অর্থাৎ ১৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি। ১৮তম গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার টাকা। এতে বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১৩৯ শতাংশ। ১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫০০ টাকা, অর্থাৎ ১৪১ শতাংশ বৃদ্ধি। সবশেষে ২০তম গ্রেডে বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। এ গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ।
অর্থাৎ নতুন বেতন স্কেলে উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন দ্বিগুণ হলেও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাচ্ছেন। বেতন তিন ধাপে, ভাতা একসঙ্গে: চাকরিজীবীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল নতুন বেতন কবে থেকে এবং কীভাবে পাওয়া যাবে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ নতুন স্কেল কার্যকর ধরা হয়েছে ১ জুলাই থেকে, কিন্তু পুরো বর্ধিত মূল বেতন একবারে দেওয়া হবে না। আর বেতন-ভাতার মধ্যে বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে।
পেনশন বাড়বে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ : শুধু চাকরিজীবী নন, অবসরভোগীদের জন্যও বড় সুখবর এসেছে। কম পেনশন পাওয়া অবসরভোগীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়াতে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে। মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনধারীদের ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়বে। ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন।

















