
মোঃ রফিকুল ইসলাম
ঢাকার শহরে বসবাসকারী অনেকেই আছেন টাকার জন্য তাঁদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করাতে পারছেন না। সাইনবোর্ড টানিয়ে অনেক স্কুলের প্রোফাইলে নাম করা শিক্ষকদের তালিকা প্রোফাইলযুক্ত করিয়া শিক্ষার নামে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। এদের অত্যাচারে অনেকেই নিরবে নিভৃতে কাঁদে। এই অসহায় মানুষগুলো সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য স্কুলের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তাদের মন গলাতে পারেন না। টাকার কারণে সৎ মানুষগুলো অসৎ মানুষের কাছে হার মেনে চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে বাসায় ফিরে আসতে হচ্ছে।
আজকাল সৎ মানুষের জায়গা এই শহরে নেই। কারণ সৎ এবং অসৎ মানুষ একই বাজারে বাজার করেন, একই সমাজে বসবাস করেন, একই মসজিদে নামাজ-কালাম পড়েন। কিন্তু অসৎ-এর কাছে সৎ মানুষগুলো পাত্তা পাচ্ছে না। দিন দিন তাদের মাঝে দূরত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। টাকার কাছে মনে হচ্ছে সবাই হার মানছেন। মসজিদের ইমাম সাহেবও অসৎ মানুষটির কাছে হার মেনে পবিত্র মসজিদের মিম্বারে বসে নবীওয়ালা কথা তেমন বলেন না। কারণ ঐ সকল মসজিদের সভাপতি বা সদস্য হন অসৎ মানুষগুলো। সত্য কথা বললে হয়তো বা ইমাম সাহেবের চাকুরী চলে যাওয়ার ভয় থাকে।
বাজারে গেলে দোকান দারের কাছে সৎ মানুষটি কোন যায়গা নেই। কারণ আপনি মাছের দর করবেন, দর কষাকষি (মুলা-মুলি) করবেন এমন সময় অসৎ মানুষটি এসেই মাছওয়ালা মানুষটিকে বলেন এই মাছগুলো কত টাকা মাছওয়ালা যা বলবে তা দিয়েই সৎ মানুষটির সামনে থেকে মাছগুলো কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে সৎ মানুষটি অসৎ মানুষটির কাছে অহরহ হার মেনে যাচ্ছে।
সরকারের বিসিএস ক্যাডারের উঁচু পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি জানাতে পেরেছেন, মনের ভাব প্রকাশ করতে পেরেছেন কিন্তু সমাজের হাজারো মানুষ তাঁর মতো ভুক্তভোগী আছেন কিন্তু তারা প্রকাশ করতে পারছে না। তারা শুধু নিরবে মহান আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলছেন। এটা ছাড়াতো তাঁদের কাছে আর কিছু নেই। একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যিক ডঃ আহম্মদ শরীফ বলেছিলেন দুর্বলেরাই আল্লাহর নাম বেশি নেয়। তাঁর এই কথার কারণে ঢাকা শহরে তাঁর বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছিল, কেন তিনি এমন কথা বলেছিলেন। সেদিন তাঁর কথা বুঝতে পারিনি। কিন্তু আজ বাস্তবে এসে প্রতিটি পদে পদে টের পাচ্ছি। কেন তিনি সেই দিন এমন উক্তি করেছিনে।
দেশে আঠারো কোটি মানুষ। সবাই কিন্তু সরকারী চাকুরী করছেন না বা এত মানুষের সরকারী চাকুরী দেয়ার মতোও নয়। তাই বাধ্য হয়েই শিক্ষিত বেকার মানুষগুলো বে-সরকারী সংস্থায় চাকুরী নেন। বে-সরকারী সংস্থায় চাকুরী করতে গিয়ে প্রতিটি মুহুর্তেই চাকুরী হারানোর ভয় থাকে। কারণ বে-সরকারী ব্যবস্থাপনায় মুহুর্তেই চাকুরীচ্যুত করা হয়। এখানে চাকুরীর নিশ্চয়তা নেই। তাইতো শিক্ষিত মানুষগুলো স্বাধীনতাবোধ শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। দেশ আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পুর্তি পালন করছে। অথচ মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ, স্বাধীনতা পাচ্ছে না।
সরকারী কর্মকর্তাদের নানা ভাবে সহযোগীতা করে দিচ্ছে। সরকারী চাকুরী করলে কোয়াটার পাচ্ছে, বৈশাখী উৎসব ভাতা পাচ্ছে, বোনাস পাচ্ছে, মহার্ঘ্য ভাতাসহ নানাবিধ সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। সাবেক অর্থমন্ত্রীর ভাষায় ফাইল মুভিং ভাতা পাচ্ছে। এছাড়াও বৈধ অবৈধ কত ধরনের সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। পক্ষান্তরে বেসরকারী মানুষগুলো চাকুরী হারানোর ভয়ে দিন দিন ধুকে ধুকে জীবন যাপন করছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের আছে আকুল আবেদন কোরজোড়ে মিনতি, আরজি জানাচ্ছি এক দেশে দুই আইন কেন? আপনি সরকারী চাকুরীজীবি মানুষকে যে ধরণের সুযোগ সুবিধা দিচ্ছেন পক্ষান্তরে বেসরকারী চাকুরীজীবি মানুষগুলোর জন্য কেন নিদের্শনা থাকে না। সরকারি-বেসরকারি সবাই একই সমাজে বসবাস করেন, একই হাট বাজার করেন। সরকারী চাকুরীজীবিরা আলাদা নয় অথচ তাদের পকেট ভর্তি টাকা থাকে যখন তখন ইচ্ছামত বাজার করেন। অথচ বেসরকারী চাকুরীজীবিরা শুধু দেখেই আসেন। কারণ তাদের পকেটে টাকা নেই। তাদের মনে শুধুই আফছোছ। একই স্কুল কলেজে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা কেউ সরকারী চাকুরীজীবি কেউ বেসরকারী চাকুরীজীবি। সবাই শিক্ষিত অথচ তাদের মধ্যে পার্থক্য বিরাজ করছে।
আজ আমরা দ্বিধাদ্ধন্ধ কারণ একই সেলেবাসে পড়াশুনা একই কারুকলমে চলে স্কুল কলেজ। সরকারি স্কুলে বেতন ৫০ টাকা বেসরকারী স্কুলে ২০০০-৫০০০ টাকা। এর কারণ কি? মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা ছিল কেউ কোচিং করতে পারবে না। আমরাও ছোট বেলায় কোচিং করিনি বা আমাদের সময় কোচিং ছিল না। আজ বাচ্চাদেরকে স্কুলে টিচিং না দিয়ে কোচিং খুলে মাস্টার সাহেবগন দেদারছে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কোন কোন মাস্টার একই ব্যাচে ৩০/৪০ জন ছাত্র ছাত্রী পড়াচ্ছেন এবং ফি নিচ্ছেন ১৫০০-২০০০ টাকা। এর একটা বিহীত সমাধান চাই।
প্রতি বছর ভর্তি ফি নিচ্ছে। একটা সভ্য সমাজে, একটি স্বাধীন দেশে এটা কি করে সম্ভব। আমরা ঠিকই স্বাধীন হয়েছি কিন্তু কিছু সংখ্যক মানুষের কারণে মুক্তি পাচ্ছি না।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারী হাসপাতালগুলো বেসামাল। মানুষ অসুস্থ্য রোগী নিয়ে হাসপাতালে গেলে নানাবিধ সমস্যায় জরজরিত হয়ে পরেন। ছুটি গল্পে ফটিক চরিত্রের কথা মনে পরে সঠিক পথ না দিখেয়ে এদিক সেদিক পথ দেখি মানুষকে কষ্ট দেয়া ছাড়া আর কিছু নয়। সরকারী হাসপাতালের মেডিকেল যন্ত্রপাতি প্রায়ই নষ্ট থাকে। এটার থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে হবে। পক্ষান্তরে বেসরকারী হাসপাতালে বিবেকহীন ডাক্তার সাহেবগণ যেমন অতিরিক্ত ফি নিয়ে চিকিৎসা দেন, আবার হাসপাতালের মালিকদেরকে খুশি করানোর জন্য অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে থাকেন। এই অসৎ ডাক্তারদের কারণে প্রতি মাসে রোগীরা ভারত থেকে চিকিৎসা নিয়ে আসে। এতে দেশের ক্ষতি, জাতির ক্ষতি এর থেকে পরিত্রাণ চাই।
আমাদের দেশের মানুষ গরীব, অসহায়, এত বেশী পরীক্ষা নিরীক্ষার খরচ যোগাতে নিজের সহায় সম্ভল শেষ করতে হচ্ছে। এছাড়া ঔষুধ পথ্যের দাম দিন দিন হুহু করে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ মানুষ দিসেহারা, পথ হারা, ঠিকানা হারা। কোন কিছু্র লাগাম ধরে রাখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে দেশে সরকার নেই। সবই নিয়ন্ত্রনের বাহিরে। সকালে এক দাম আবার বিকালে এক দাম। কোন সাংবাদিক মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে প্রশ্ন করলে মন্ত্রী মহোদয় উত্তর দেন এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানেন। প্রশ্ন হলো মাননীয় প্রধানম্ত্রী কি জানেন। সবার মনে একই প্রশ্ন তাহলে মন্ত্রীরা কেন?
সন্ত্রাসীরা রুপ বদলাচ্ছে। একসময় রাতের অন্ধকারে বা জনশূন্য নির্জন স্থানে ছিনতাই হতো। রাতের অন্ধকারে ডাকাতি হতো। চুরি হতো। কিন্তু আজ সেটার থেকে কিছুটা রেহাই পেয়েছে। আজ কষ্ট করে সন্ত্রাসী কায়দা খুঁজতে হচ্ছে না। দিনের বেলায় মানুষের সমাগম স্থানেই ভদ্র বেসে ছিনতাই, চুরি, রাহাজানি হচ্ছে। ১ টাকার জিনিস নয় টাকা বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মাসেই গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। সকল পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ সাধারণ মানুষ অসহায়। কারণ তারা সুদ, ঘূষ, রাহাজানি করতে পারছে না। আবার সরকারের থেকেও কোন সুবিধা পাচ্ছে না।
বাহালুল শাহ্ পাগল বলেছিলেন দুই লক্ষ টাকা হলে বেহেস্ত কেনা যাবে। আজ আমরা দেখছি সেই খেলা। সন্ত্রাসী ব্যবসায়ীরা ভদ্র কায়দায় সাধারণ মানুষের থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। তারা বছর বছর হজ্ব পালন করছে, মাসে মাসে ওমরা পালন করছে। এমনও শোনা যাচ্ছে কেউ কেউ নাকি রোজার মাসে এলেই ইতেকাফে বসার জন্য মক্কায় যায়। আবার কেউ কেউ নাকি ফজর নামাজ কাবা শরীফে পড়তে যায়, নামাজ শেষে দেশে চলে আসে। এরা কারা, এদেরকে চিহ্নিত করতে হবে। দেশ ও জাতিকে বাঁচাতে হবে।
লেখকঃ মোঃ রফিকুল ইসলাম, একান্ত সচিব, সিইও এবং চেয়ারম্যান, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স কোঃ লিঃ, ঢাকা, বাংলাদেশ।

















