মোঃ রফিকুল ইসলাম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৭ মার্চ ১৯২০ সালে বৃহত্তর ফরিদপূরের গোপালগঞ্জ থানার অন্তুর্গত টঙ্গীপাড়া নামক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে শাহাদাৎ বরণ করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্ত্বিত্ব। তিনি ভারত বিভাজন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে পূর্বপাকিস্তান স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কেন্দ্রীয়ভাবে নেতৃত্ব প্রদান করেন।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক প্রদত্ত ১৭ মিনিটের ভাষণ ইউনেসকো কর্তৃক ঘোষিত সর্বকালের সর্বশ্রেষষ্ঠ ভাষণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করা বাঙালী জাতির জাতির জন্য এক বিরল উপহার। জাতির জনকের প্রজ্ঞা বিছনক্ষতা দেখে তাঁর ওজন মাপকাঠির ভিত্তিতে নির্ণয় করে “ফিদেল কাস্ত্রো” বলেছিলেন আমি হিমালয় দেখিনি তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে দেখেছি।
১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত বিভাগ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে শেখ মুজিব ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে আওয়ামী লীগের সভাপতি, এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেছনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে কৃতিত্ব স্বরূপ তাকে বাংলাদেশের “জাতির জনক” বা “জাতির পিতা” হিসেবে অভিহিত করা হয়। এছাড়াও তাঁকে প্রাচীন বাঙালি সভ্যতার আধুনিক স্থপতি ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তৎকালীন ছাত্র নেতা এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভুত্থানের মহানায়ক জনাব তোফায়েল আহমেদ, এমপি তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। সে থেকেই শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হিসেবেই অধিক পরিচিতি লাভ করেন।
তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা স্বায়ত্তশাসন পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন যাকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিকল্পনা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তিনি আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের অন্যতম বিরোধী পক্ষে পরিণত হন।
১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকারের সাথে যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাকে প্রধান আসামি করে আগরতলা মামলা দায়ের করা হয়; পরবর্তীতে যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবে পরিচিত পায়। তবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের কারণে তৎকালীন সরকার তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে; তা সত্ত্বেও তাঁকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়া হয়নি।
পাকিস্তানের নতুন সরকার গঠন বিষয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে শেখ মুজিবের আলোচনা বিফলে যাওয়ার পর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে অপারেশন সার্স লাইট নামে গণহত্যা। ফলশ্রুতিতে, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। একই রাতে তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।
তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার রহিমুদ্দিন খানের সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলেও তা কার্যকর করা হয়নি। নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে “বাংলাদেশ” নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।
১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই জানুয়ারি শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জানুয়ারি তিনি সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মতাদর্শগতভাবে তিনি বাঙালি জাতীয়বাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায়
বিশ্বাসী ছিলেন; যা সম্মিলিতভাবে মুজিববাদ হিসাবে পরিচিত। এগুলোর উপর ভিত্তি করে সংবিধান প্রণয়ন এবং তদানুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার চেষ্টা সত্ত্বেও তীব্র দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সর্বত্র অরাজকতাসহ ব্যাপক দুর্নীতি মোকাবেলায় তিনি কঠিন সময় অতিবাহিত করেন। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনের লক্ষ্যে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রবর্তন করতে বাধ্য হন। এর সাত মাস পরে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই আগস্ট একদল উচ্চবিলাসী ও বিছিন্নতাবাদী সামরিক কর্মকর্তার হাতে তিনি সপরিবারে শহীদ হন।
২০০৪ সালে বহুমুখি মিডিয়া বিবিসি কর্তৃক পরিচালিত জনমত জরিপে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বৎসরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত হন।
পরিশেষে, আমরা বাংলাদেশের স্থপতি এই মহান নেতার প্রতি আকুন্ঠ শ্রদ্ধা/সম্মান এবং ভালোবাসা রেখে মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট তাঁর ও তাঁর পরিবারের রুহহের মাকফেরাত কামনা করছি এবং একইসাথে মহান আল্লাহ তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সকল শহীদদেরকে জান্নাতবাসী করুন।
লেখকঃ মোঃ রফিকুল ইসলাম, ইসলামী কর্মাশিয়াল ইন্স্যুরেন্স কোঃ লিঃ, ঢাকা-বাংলাদেশ।

















