হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক পানির প্রবল স্রোত ও ধ্বংসাবশেষের ঢলে নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার (২৯ আগস্ট) পর্যন্ত দুই দেশে প্রায় ৩ হাজার মানুষের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি এবং উদ্ধার করা হয়েছে ৬৩৩টি মরদেহ। দুর্গত এলাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা থাকায় উদ্ধার অভিযানও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের তালিকায় নতুন করে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকর্মীর নাম যুক্ত হয়েছে। ওই অঞ্চলে বড় ধরনের বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্প রয়েছে। এর আগে নিখোঁজের তালিকায় তীর্থযাত্রী ও ট্রেকারদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। নেপালের সর্বশেষ হিসাবে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৬২৬ জন। পাশাপাশি ২ হাজার ৪২৬ জনের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। নিখোঁজদের মধ্যে কয়েকশ বিদেশিও রয়েছেন। অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনা কর্তৃপক্ষ দুর্গত এলাকা থেকে ৫৫৫ জন আটকে পড়া পর্যটক ও ৪৯৯ জন চীনা নাগরিককে সরিয়ে নিয়েছে। তিব্বতের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গিরং এলাকায় নতুন বন্যার আশঙ্কায় কিছু সময়ের জন্য উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছিল।
পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, পরিস্থিতির ঝুঁকি কমেছে। শনিবার সকালে ওই এলাকায় দুই গ্রামবাসীকে জীবিত উদ্ধারের খবরও দিয়েছে সিনহুয়া। ভারতেও নেপাল থেকে প্রবাহিত নদীগুলোতে সাতটি মরদেহ পাওয়া গেছে। এগুলো বন্যায় ভেসে যাওয়া মানুষের মরদেহ হতে পারে বলে ধারণা করছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। নিখোঁজদের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে যাওয়া বহু হিন্দু তীর্থযাত্রী রয়েছেন।
বুধবারের (২৬ আগস্ট) এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯৩ হাজার হতে পারে বলে জানিয়েছে রেড ক্রস। সংস্থাটি বলেছে, বিপর্যয়ের মাত্রা অত্যন্ত বড় এবং মৃতের সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে খাবার ও পানির মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বন্যার পানির সঙ্গে বরফ ও কাদা প্রবাহিত হয়ে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় জলাধার তৈরি হয়েছে। এসবের একটি এখন উদ্ধারকর্মীদের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। নতুন করে পানি নামার আশঙ্কায় নেপালের পুলিশ উদ্ধারকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তিব্বতের দিকে একটি পানির বাঁধ আবার ভেঙে যাওয়ার তথ্য তারা পেয়েছে।
নেপালের ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে কয়েকজন মানুষ আটকে থাকার সন্ধান পেয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। তাদের বের করে আনতে সুড়ঙ্গে প্রবেশের পথ খুঁজছেন উদ্ধারকারীরা। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, দু’টি হেলিকপ্টার সেখানে পাঠানো হয়েছে। তবে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় ৩৫০ শ্রমিক ও বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই এলাকায় আরো শতাধিক মানুষ আটকে রয়েছেন, তাদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ত্রিশূলী উপত্যকার অন্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের বর্ণনায়ও দুর্যোগটির ভয়াবহতা উঠে এসেছে।
বুদ্ধ তামাং জানান, বন্যার সময় তিনি একটি বাঁধের সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। তবে তার কর্মস্থলের অন্য পাশে থাকা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পানির স্রোতে ভেসে যান। ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে থাকার পর বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) হেলিকপ্টারে তাকে উদ্ধার করা হয়। বেঁচে যাওয়া মানুষের অনেকেই জানিয়েছেন, পানির স্রোতে তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। নিখোঁজ স্বজনদের কোনো খবর না পাওয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। বুদ্ধি রাম দাঙ্গোল এএফপিকে বলেন, নদীর আশপাশের সব বসতি ভেসে গেছে। কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।
সামঝানা থিং জানান, তার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর তিন দিন ধরে তিনি কোনো খবরের অপেক্ষায় আছেন। তিনি বলেন, আমরা কিছুই জানি না। আশা করছি, সে নিরাপদ কোনো জায়গায় আছে। দুর্যোগের সময় ভারতের যাত্রী শিবরঞ্জনী মুথুনাথনও একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। ৪৬ বছর বয়সী এই নারী ৫৬ জনের সঙ্গে বাসে করে চীনা সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন, যানজটের কারণে বাস থেমে আছে। পরে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। মুথুনাথন জানান, কুয়াশা ও ধোঁয়ার মতো কিছু তাদের চারপাশ ঘিরে ফেলে এবং মুহূর্তের মধ্যে পানির বিশাল স্রোত তাদের দিকে এগিয়ে আসে। তার ধারণ করা মোবাইল ভিডিওতে সেই স্রোতের দৃশ্যও রয়েছে। আশপাশের গাড়িগুলো পানিতে ভেসে যায় কিংবা কাদার নিচে চাপা পড়ে। তিনি জানান, একে একে তারা চালকের পাশের দরজা দিয়ে বাস থেকে বেরিয়ে একটি পাহাড়ে উঠে আশ্রয় নেন।


















